রাজনৈতিকতা

আযাদ মুসলিম রাষ্ট্রের স্বপ্ন

ইবন আদম

ইকবালের এলাহাবাদের এই ঐতিহাসিক ভাষণ পাকিস্তান রাষ্ট্রের দার্শনিক ও রাজনৈতিক বয়ান হিসেবে তাৎপর্যপূর্ণ। পাকিস্তান ধারণা বিনির্মাণে ইসলামের ভূমিকা এবং নয়া রাষ্ট্রের সাথে ইসলামের সম্পর্ক কি হবে তা নিয়ে ইকবালের প্রস্তাব ও পর্যালোচনা রয়েছে এই ভাষণে। ইউরোপের ধর্মনিরপেক্ষতবাদ আর ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ও আধিপত্যবাদের বিপরীতে ইকবাল মুসলিম জাতীয়তাবাদের যে প্রস্তাবনা পেশ করেছেন তা আজো প্রাসঙ্গিক। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিমন্ডলে সমসাময়িক রাজনৈতিক ও আদর্শিক সংকটের প্রেক্ষিতে সঞ্চারণ এই ঐতিহাসিক ভাষণটি পাঠকের জন্য সংশোধিত ও পরিমার্জিত আকারে পুনঃপ্রকাশ করেছে। - সম্পাদক

[১৯৩০ সালের ২৯ ডিসেম্বর এলাহাবাদে অনুষ্ঠিত নিখিল-ভারত মুসলিম লীগের ঐতিহাসিক অধিবেশনে আল্লামা ইকবালের প্রদত্ত সভাপতির ভাষণ]

সুধীমন্ডলী, ভারতে মুসলিম রাজনৈতিক চিন্তাধারা ও কার্যকলাপের সর্বাধিক সংকট-সন্ধিক্ষণে আপনারা নিখিল-ভারত মুসলিম লীগের এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবার জন্য আমাকে আহবান করে যে সম্মান প্রদর্শন করেছেন, তার জন্য আমি আপনাদের কাছে গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। নিঃসন্দেহে এই বিরাট জনসমাবেশে এমন বহু লোক আছেন, যাঁরা আমার চেয়ে বহুগুণে অধিক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং যাঁদের রাজনীতি জ্ঞানের প্রতি আমি উচ্চতম শ্রদ্ধা পোষণ করি। সুতরাং আজকের এই জনসমাবেশ যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য আহুত হয়েছে, তৎসম্পর্কে আমি কোনো নির্দেশ দেবার দাবী করলে তা প্রগলভতার শামিল হবে। আমি কোনো দলের নেতা নই; কোনো নেতার অনুসরণ আমি করি না। আমি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অংশ ব্যয় করেছি ইসলামের সযত্ন অধ্যয়নে – ইসলামের কানুন ও রাষ্টব্যবস্থা, তার তমদ্দুন, তার ইতিহাস ও সাহিত্য অধ্যয়নে। আমার মনে হয়, ইসলামের প্রাণবস্তুর সাথে এই অবিরাম সংযোগের ফলে তা আমার উপলব্ধিতে যেভাবে প্রকাশ লাভ করেছে, তার ফলে বিশ্বজনীন সত্য হিসাবে ইসলামের তাৎপর্য সম্পর্কে আমি এক ধরনের অন্তর্দৃষ্টির অধিকার লাভ করেছি। তার মূল্য যাই হোক, এরই পরিপ্রেক্ষিতে, ভারতের মুসলিম জনগণ ইসলামের প্রাণবস্তুর প্রতি সত্যিকারভাবে আস্থশীল থাকতে দৃঢ় সংকল্প ধরে নিয়ে, আমি আপনাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে নির্দেশনা দিব না বরং আমার মতে যেসব মূলনীতি দ্বারা সেসব সিদ্ধান্তের সাধারণ প্রকৃতি নির্ধারিত হবে তা সুস্পষ্টভাবে আপনাদের উপলব্ধিতে আনার ক্ষুদ্র চেষ্টা করবো।

১। ইসলাম এবং জাতীয়তাবাদ

একথা অস্বীকার করা যায় না যে, একটি নৈতিক আদর্শ ও বিশেষ ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসাবে ইসলামই ভারতের মুসলিম জনগণের জীবন-ইতিহাস প্রধান গঠনমূলক উপাদান হয়ে আছে। বিশেষ ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা বলতে আমি বুঝি আইনসংক্রান্ত একটি বিশেষ ধারা নিয়ন্ত্রিত ও একটি সুনির্দিষ্ট নৈতিক আদর্শে অনুপ্রাণিত সামাজিক কাঠামো। তা থেকে এমন সব মৌলিক আবেগ ও আনুগত্য জন্ম নিয়েছে, যা বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি ও শ্রেণীকে ঐক্যবদ্ধ করে শেষ পর্যন্ত তাদেরকে এক সুনির্দিষ্ট জাতিতে পরিণত করে। প্রকৃতপক্ষে একথা বললে মোটেই অতিরঞ্জন হবে না যে, সম্ভবতঃ ভারতই দুনিয়ার একমাত্র দেশ, যেখানে ইসলাম জাতিগঠনকারী শক্তি হিসাবে সব চাইতে বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে। অন্যান্য দেশের ন্যায় ভারতেও সমাজ হিসাবে ইসলামের কাঠামো প্রায় সম্পূর্ণরূপে গড়ে উঠেছে সুনির্দিষ্ট নৈতিক আদর্শে অনুপ্রাণিত তমদ্দুন হিসাবে ইসলামের কার্যকারিতার মাধ্যমে। আমার বক্তব্য হচ্ছে এই যে, মুসলিম সমাজ বলতে যা দেখি তা ইসলামী তমদ্দুনের সাথে সংশ্লিষ্ট আইনকানুন ও প্রতিষ্ঠানের চাপেই তার উল্লেখযোগ্য সমজাতীয়তা (homogeneity) ও অভ্যন্তরীণ ঐক্যসহকারে রূপ লাভ করেছে।

অবশ্য ইউরোপীয় রাজনৈতিক চিন্তাধারায় যে ধারণাসমূহ প্রকাশ লাভ করছে, তাতে ভারত ও ভারতের বাইরের বর্তমান যুগের মুসলিমদের দৃষ্টিভঙ্গিতে দ্রুত পরিবর্তন আসছে। এইসব ধারণায় অনুপ্রাণিত আমাদের সমাজের তরুণতর লোকেরা ইউরোপের এসব চিন্তাধারার বিবর্তনের শেকড়ে যেসব বাস্তবতা কাজ করেছে তার সমালোচনামূলক উপলব্ধি ব্যতীতই সেসব ধারণাকে নিজ নিজ দেশে জীবন্ত শক্তি (living force) হিসাবে দেখবার জন্য আগ্রহী। ইউরোপে খৃষ্টধর্ম বলতে বুঝাতো একটা নিছক সন্যাস-আশ্রম-আশ্রয়ী বিধানকে (Monastic Order), যা ক্রমে ক্রমে বিকাশ লাভ করেছে এক বিরাট গির্জা প্রতিষ্ঠানে। লুথারের প্রতিবাদ অভিযান চালিত হয়েছিলো গির্জা-প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে, পার্থিব ধরনের কোনো রাষ্ট্র বিধানের বিরুদ্ধে নয় এবং তার সুস্পষ্ট কারণ ছিলো এই যে, খৃষ্টধর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট তেমন কোনো রাষ্ট্রশাসন ব্যবস্থার অস্তিত্বই ছিলো না। এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে লুথারের বিদ্রোহ করার যৌক্তিকতাও পুরোপুরিই ছিলো; যদিও আমার মনে হয়, তিনি তখন এ সত্য উপলব্ধি করেন নি যে, ইউরোপের তখনকার চলতি অবস্থায় তার বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত বহুবিধ জাতীয় তথা সংকীর্ণতর নৈতিক পদ্ধতির জন্ম দিয়ে যিশুর বিশ্বজনীন নীতিবাদকে বিপর্যস্ত করবে। এমনি করে রুশো ও লুথারের ন্যায় ব্যক্তিদের উদ্যাগে চালিত বুদ্ধিবৃত্তি সংক্রান্ত আন্দোলনের অভ্যুত্থানের ফল হলো একককে পরস্পর সমন্বয়হীন বহুতে পরিণত করা (Mutually Ill-adjusted many), মানবীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে রূপান্তর এবং তার বাহন হিসাবে প্রয়োজন হলো দেশের ধারণার মতো অধিকতর বাস্তবিক ভিত্তির এবং তা বিকাশ লাভ করতে লাগলো জাতীয় ধারায় উদ্ভূত বিভিন্ন রাষ্ট্রশাসন পদ্ধতির মাধ্যমে। জাতীয় ধারার অর্থ হলো: যে ধারায় অঞ্চলকে স্বীকার করা হয় রাজনৈতিক সংহতির একমাত্র নীতি হিসাবে। আপনারা যদি ধর্মসংক্রান্ত ধারণাকে সুম্পূর্ণরূপে পারলৌকিক ব্যাপার বলে বিবেচনা করতে শুরু করেন, তাহলে ইউরোপের খৃষ্টধর্মের যে পরিণতি হয়েছে, তা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। নীতিবাদ ও রাষ্ট্রশাসন ব্যবস্থার জাতীয় পদ্ধতি দ্বারা যিশুর বিশ্বজনীন নীতিবাদ বিপর্যস্ত হয়েছে। ফলে ইউরোপ যে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে বাধ্য হয়েছে, তা হচ্ছে: ধর্ম হলো ব্যক্তিবিশেষের ঘরোয়া ব্যাপার এবং মানুষের জীবনের সাথে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই।

ইসলাম মানুষের একত্বকে (Unity) আত্মা ও বস্তুর সমন্বয়াতীত দ্বৈতবাদে (Duality) বিভক্ত করে না। ইসলামে আল্লাহ ও বিশ্বপ্রক্রিয়া, আত্মা ও বস্তু, উপাসনাগার ও রাষ্ট্র পরস্পরের পরিপূরক। মানুষ অন্যত্র অবস্থিত আত্মিক জগতের খাতিরে উপেক্ষণীয় এক অপবিত্র জগতের বাসিন্দা নয়। ইসলামের কাছে বস্তু হচ্ছে এমন আত্মা যা স্থান ও কালের মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করে। ইউরোপ সম্ভবতঃ ম্যানিকিয়ান চিন্তাধারা (Manichaean Thought) থেকে আত্মা ও বস্তুর দ্বান্দ্বিক মতবাদকে নির্বিচারে গ্রহণ করেছিলো। ইউরোপের শ্রেষ্ঠ চিন্তানায়গকগণ আজ শুরুর দিককার এই ভ্রান্তি উপলব্ধি করছেন, কিন্তু তাদের রাজনীতিকরা পরোক্ষভাবে দুনিয়াকে বাধ্য করছেন তাকে প্রশ্নাতীত মতবাদ বলে স্বীকার করে নিতে। আত্মিক ও পার্থিবের মধ্যে এই ভ্রান্তিমূলক বিভেদ সৃষ্টি ইউরোপের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক চিন্তাধারাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে এবং প্রকৃতপক্ষে তার ফল হয়েছে ইউরোপীয় রাষ্ট্র-জীবন থেকে খৃষ্টধর্মের পূর্ণ নির্বাসন। এর ফলে গড়ে উঠেছে মানবীয় স্বার্থের পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত পরস্পর সামঞ্জস্যহীন (Ill-adjusted) রাষ্ট্রগোষ্ঠি। এই পরস্পর সামঞ্জস্যহীন রাষ্ট্রগোষ্ঠি খৃষ্টধর্মের নীতি ও বিশ্বাসসমূহকে পদদলিত করার পর আজ প্রয়োজন অনুভব করছে এক ইউরোপীয় যুক্তরাষ্ট্রের, অর্থাৎ সেই ঐক্যের প্রয়োজনই সে অনুভব করছে, যা খৃষ্টীয় গির্জা-প্রতিষ্ঠান বুনিয়াদীভাবে তাদেরকে দান করেছিলো, অথচ খৃষ্টের মানব-ভাতৃত্বের আলোকে তার সংস্কার সাধনের পরিবর্তে লুথারের প্রেরণায় তারা তা ধবংস করাকেই যথার্থ মনে করেছিল।

ইসলামী দুনিয়ায় একজন লুথার একটি অসম্ভব ব্যাপার; কারণ এখানে মধ্যযুগীয় খৃষ্টধর্মের অনুরূপ কোনো গির্জা-প্রতিষ্ঠান নেই, যার জন্য কোনো ধ্বংসকারীর প্রয়োজন হতে পারে। ইসলামী জাহানে আমাদের রয়েছে এক বিশ্বজনীন রাষ্ট্রশাসন ব্যবস্থা যার মৌলিক বিষয়াদি নাজিল করা হয়েছে বলে আমরা বিশ্বাস করি, তবে আধুনিক দুনিয়ার সাথে ফকিহদের সংস্পর্শের অভাবে তার কাঠামোগত দিকগুলোতে নতুনতর শক্তি সঞ্চার করবার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। ইসলামী জাহানে জাতীয় (national) ধারণার চূড়ান্ত ভাগ্য কি হবে, তা আমি বলতে পারি না। ইসলাম ইতিপূর্বে ভিন্ন ভাবধারা-প্রকাশক বহু ধারণাকে যেমন আত্মস্ত করে নতুন রূপদান করেছে এক্ষেত্রেও তেমনি কিছু হবে নাকি তার নিজস্ব শক্তি দিয়ে এর আমূল পরিবর্তন সাধন করবে সে সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বানী করা কঠিন। সেদিন লিডেনের (হল্যান্ড) অধ্যাপক ওয়েনসিংক আমার কাছে লিখেছেন: “It seems to me that Islam is entering upon a crisis through which Christianity has been passing for more than a century. The great difficulty is how to save the foundations of religion when many antiquated notions have to be given up. It seems to me scarcely possible to state what the outcome will be for Christianity, still less what it will be for Islam.” – “আমার মনে হয়, খৃষ্টধর্ম গত এক শতকের অধিককাল যে সংকট অতিক্রম কর চলেছে, ইসলামও তেমনি এক সংকট-পরিস্থিতিতে প্রবেশ করছে। একদিকে যেমন বহু প্রাচীন ধারণাকে উচ্ছেদ করবার প্রয়োজন রয়েছে, তেমনি কি করে ধর্মের বুনিয়াদ বাঁচিয়ে রাখা যাবে, সেটাই হচ্ছে এক জটিল সমস্যা। খৃষ্টধর্মের জন্য কি পরিণাম প্রতীক্ষা করছে, তা বলা আমার পক্ষে কদাচিত সম্ভব, আরো কম সম্ভব হছে ইসলামের পরিণাম নির্ধারণ করা।” বর্তমান মুহূর্তে জাতীয় ধারণা (National Idea) মুসলিম দৃষ্টিভঙ্গিকে গোষ্ঠিকেন্দ্রিক করে তুলেছে এবং এমনি করে বাস্তবক্ষেত্রে ইসলামের মানবীয় কার্যকলাপের গতি রুদ্ধ করছে। এই গোষ্ঠি-চেতনার (Racial Consciousness) বিকাশের ফলে অন্যতর মানদন্ডের বিকাশ গঠতে পারে এবং এমনকি, তা ইসলামী মানদন্ডের সাথে সাংঘর্ষিক কিছুও হতে পারে।